একটি জন্ম নিবন্ধন থাকতে কি আরেকটি জন্ম নিবন্ধন করা যায়?

একটি জন্ম নিবন্ধন থাকতে কি আরেকটি জন্ম নিবন্ধন করা যায়? কমন এই প্রশ্নটি অনেকেই আমাদের করে থাকে যা একটি সাধারণ প্রশ্ন হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। এই ভিডিওটা সম্পূর্ণ কন্টিনিউ করলে আপনার হয়তো এই বিষয়ে আর কোন জানার বিষয় বাকী থাকবে না।

আমাদের দেশে অনেকেই এই সমস্যায় পড়েন। তবে এর সরাসরি এবং আইনি উত্তর হলো:  আপনি আগের জন্ম নিবন্ধনটি বাদ দিয়ে বা সচল রেখে নতুন আরেকটি জন্ম নিবন্ধন করতে পারবেন না। তবে কিছু কিছু জটিল ক্ষেত্রে সেটাও করা সম্ভব। তার আগে বলি একটি নিবন্ধন থাকতে কেন নতুন আরেকটি নিবন্ধন করতে পারবেন না। আর কারা কারা এবং কোন অবস্থায় গেলে আপনি একটি   নিবন্ধন থাকা সত্ত্বেও আরেকটি নিবন্ধন করতে পারবেন সে প্রসঙ্গও আসছে সামনে।



বাংলাদেশ সরকারের বিধিমালা অনুযায়ী, একজন নাগরিকের কেবল একটিই জন্ম নিবন্ধন নম্বর (BRN) থাকতে পারবে। কেন আপনি নতুন করে আরেকটি করতে পারবেন না এবং এর সঠিক সমাধান কী বুঝিয়ে বলছি নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

১. নতুন জন্ম নিবন্ধন কেন করা যাবে না?

  • আইনি জটিলতা ও শাস্তি: একই ব্যক্তির দুটি জন্ম নিবন্ধন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। তথ্য গোপন করে দ্বিতীয়বার জন্ম নিবন্ধন করলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

  • ডিজিটাল লক (Duplicate Matching): বর্তমানে জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং সেন্ট্রাল ডাটাবেজের আওতাভুক্ত। আপনি যদি নতুন করে আবেদন করতে যান, তবে আপনার পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ বা ঠিকানা মিলে গেলে সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটিকে "ডুপ্লিকেট" বা দ্বৈত নিবন্ধন হিসেবে আটকে দেবে।

২. নতুন নিবন্ধন করা ছাড়া সমাধানের উপায় কী?

আপনার জন্ম নিবন্ধনে যদি কোনো ভুল থাকে (যেমন: নামের বানান, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ বা ঠিকানা), তবে নতুন নিবন্ধন না করে বর্তমান নিবন্ধনটি সংশোধন করতে হবে।

সংশোধনের পদক্ষেপসমূহ:

  • অনলাইনে আবেদন: প্রথমে bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে "জন্ম তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন" অপশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংশোধন করতে হবে।

  • প্রমাণক বা ডকুমেন্টস: আপনি যে তথ্যটি সংশোধন করতে চান, তার সপক্ষে সঠিক প্রমাণপত্র (যেমন: জেএসসি/এসএসসি সার্টিফিকেট, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা পিতা-মাতার এনআইডি) আপলোড করতে হবে।

  • কার্যালয়ে যোগাযোগ: অনলাইন আবেদন শেষে ফর্মটি প্রিন্ট করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আপনার স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে জমা দিয়ে যোগাযোগ করতে হবে।

৩. যদি আগের নিবন্ধন নম্বরটি হারিয়ে যায় বা খুঁজে না পাওয়া যায়?

অনেকে ভাবেন আগেরটি যেহেতু খুঁজে পাচ্ছি না, তাই নতুন একটা করে ফেলি। এটাও ভুল পদ্ধতি।

  • আপনার আগের জন্ম নিবন্ধনটি যদি হাতে লেখা (১৬ ডিজিটের) হয়ে থাকে বা নম্বর মনে না থাকে, তবে আপনার সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ে (ইউপি/পৌরসভা) যোগাযোগ করে পুরাতন বালাম বই থেকে সেটি খুঁজে বের করতে হবে এবং সেটিকে ডিজিটাল (১৭ ডিজিট) করে নিতে হবে।

আপনার জন্য পরামর্শ: জন্ম নিবন্ধনে যেকোনো সমস্যা হলে নতুন করার চিন্তা বাদ দিয়ে "জন্ম নিবন্ধন সংশোধন" প্রক্রিয়ার সাহায্য নেওয়াই একমাত্র আইনি ও সঠিক পথ। কিন্তু যারা একেবারেই এটা করতে পারছেন না এবং কারা একটি নিবন্ধন থাকার পরেও আরেকটি ক্রুতে পারবেন সে প্রসঙ্গে বলি।

৪. যদি আপনি ২ টি নিবন্ধন অলরেডি করে ফেলেছেন?

যদি কোনো কারণে বা অসাবধানতাবশত আপনার একটি নিবন্ধন থাকা সত্ত্বেও আরেকটি নতুন জন্ম নিবন্ধন হয়ে গিয়ে থাকে, তবে আপনি বর্তমানে একটি বড় আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতার মধ্যে আছেন। বর্তমান ডিজিটাল সিস্টেমে একজন নাগরিকের দুটি সচল জন্ম নিবন্ধন থাকা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এর ফলে পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট বা কোনো সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার পুরো প্রোফাইল লক বা ব্লক হয়ে যেতে পারে। আইন অনুযায়ী আপনার দুটি নিবন্ধনের মধ্যে একটি অবশ্যই স্থায়ীভাবে বাতিল বা ডিলিট করে দিতে হবে। আপনি নিজে অনলাইন থেকে এটি করতে পারবেন না, এর জন্য আপনাকে অফিশিয়াল প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

৫. কারা একটি নিবন্ধন করা থাকলেও আরেকটি নিবন্ধন করতে পারবেন?

যারা বয়স সমস্যার কারণে একটি বাদ দিতে চান তাহলে এটা কোন ভাবেই করা যাবে না এর কারণ আমরা উপরে আলোচনা করেছি। তবে যাদের জন্ম নিবন্ধনে নামের পরিবর্তন আছে, যেমন হলো নাজমুল কিন্তু নিবন্ধন আছে একরামুল অথবা আপনার পিতার নাম আঃ রহমান কিন্তু নিবন্ধনে এসেছে আঃ রহিম তাহলে আপনি আরো একটি নিবন্ধন করতে পারবেন। তবে এর জন্য আপনার সেটা প্রমাণের ডকোমেন্ট লাগবে। এটা শুধু তাদের জন্য করার সুযোগ রয়েছে যাদের ১ম নিবন্ধনটি ২০২০ সাল বা তার আগে নিবন্ধিত কারণ এরপরে যাদের নিবন্ধন করা আছে তাদের নিবন্ধনে পিতা-মাতার নিবদন্ধন কিন্তু ম্যাপিং করা সেজন্য আপনি অনলাইনে এটার জন্য আবেদনই দাখিল করতে পারবেন না। এখানেও আমাদের পরামর্শ হলো এভাবে হয়তো সাময়িকভাবে পার পেয়ে যাবে। কিন্তু আসল ঝামেলাটা পাকবে যখন সে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পাসপোর্ট করতে যাবেন, আপনার পাসপোর্ট এবং এনআইডি সার্ভারে কিন্তু আপনার প্রথম নিবন্ধনটি দেয়া আছে। 

অনেকে আছেন যারা ভাবেন, "আমার তো মামা-চাচা আছে" কিংবা "রাজনৈতিক হেডাম" বা বিশেষ কোনো ব্যক্তি ধরে ব্যাকডোর দিয়ে এই কাজটি করিয়ে ফেলবেন। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যে বলছি—বর্তমানে সব সিস্টেম যেহেতু সেন্ট্রাল ডাটাবেজের আওতায় চলে এসেছে, তাই সাময়িকভাবে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দিয়ে আপনি হয়তো একটি ডুপ্লিকেট জন্ম নিবন্ধন বের করতে পারবেন, কিন্তু দিনশেষে যখন আপনার তথ্য যাচাই হবে, তখন কোনো "হেডাম" বা তদবির আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। তখন ফেঁসে যাবেন আপনি নিজেই। দেশের এই আইন গুলো এতোই জটিল যে জাতীয় সার্ভার থেকে একটা তথ্য মুছা প্রায় অসম্ভব। জাতীয় সার্ভার এতোটাই শক্তীশালী যে এটা একমাত্র সংসদে আইন করে সিস্টেম বাতিল করতে হবে।

তাই আসল কথা হলো—নামে যত বড় ভুলই থাক না কেন, নতুন নিবন্ধন করার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত না নিয়ে, আপনার কাছে থাকা সঠিক ডকুমেন্টস দিয়ে আগের জন্ম নিবন্ধনটিই নিয়ম মেনে সংশোধন করিয়ে নিন। এটাই একমাত্র আইনি, নিরাপদ এবং সঠিক পথ। সাময়িক সুবিধার জন্য নিজের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে না ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ—আর এটাই আমাদের কাম্য।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url